ঘরে ইন্টারনেটের লাইন আসে একটাই। অথচ ফোন, ল্যাপটপ, টিভি, সিসিটিভি — সবাই একসাথে চলে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাজটা করে দেয় যে ছোট বাক্সটি, সেটিই রাউটার।
নামটা এসেছে route শব্দ থেকে — পথ। কাজটাও তাই: কোন ডেটা কোন পথে, কার কাছে যাবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। মোড়ে দাঁড়ানো ট্রাফিক পুলিশ যেমন গাড়ি দেখে ঠিক করে দেয় কে কোন দিকে যাবে, রাউটারও প্রতি সেকেন্ডে হাজারো ডেটা প্যাকেট নিয়ে ঠিক সেই কাজটাই করে।
নিচে দেখা যাক ভেতরে কী থাকে, ONU-র সাথে পার্থক্যটা কোথায়, আর ইন্টারনেট ধীর লাগলে রাউটারের দিকটা কীভাবে যাচাই করবেন।
রাউটার কী — কাজটা আসলে কেমন
রাউটার একটি নেটওয়ার্ক ডিভাইস, যা একাধিক কম্পিউটার বা ডিভাইসকে একে অপরের সাথে এবং ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত করে।
ইন্টারনেটে ডেটা যায় ছোট ছোট টুকরোয় — এগুলোকে বলে প্যাকেট। প্রতিটি প্যাকেটের গায়ে গন্তব্যের ঠিকানা লেখা থাকে। রাউটার সেই ঠিকানা পড়ে, নিজের কাছে থাকা রুটিং টেবিল মিলিয়ে দেখে, তারপর প্যাকেটটিকে সঠিক পথে ছেড়ে দেয়।
ঘরের ভেতরেও কাজটা একই। ইউটিউবের ভিডিও যাবে টিভিতে, হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ যাবে ফোনে — দুটো একসাথে আসলেও মিশে যায় না, কারণ রাউটার প্রত্যেকের ঠিকানা আলাদা করে চেনে।
রাউটার কেন লাগে
- একাধিক ডিভাইস: ISP সাধারণত একটি সংযোগ দেয়। সেটি দিয়ে ঘরের দশটি ডিভাইস চালাতে হলে মাঝখানে রাউটার লাগবেই।
- ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ: কোন ডেটা কার কাছে যাবে সেটি ঠিক করে দেয়, ফলে একজনের ভিডিও অন্যজনের ফোনে চলে যায় না।
- নিরাপত্তা: ফায়ারওয়াল আর NAT মিলে ঘরের ডিভাইসগুলোকে বাইরের সরাসরি নাগাল থেকে আড়াল করে রাখে।
- নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ: একই নেটওয়ার্কের ভেতরে ফাইল আদান-প্রদান বা প্রিন্টার শেয়ার করা যায় — ইন্টারনেট ছাড়াই।
- গতির ভাগাভাগি: QoS থাকলে কোন ডিভাইস কতটুকু ব্যান্ডউইথ পাবে সেটিও ঠিক করে দেওয়া যায়।
রাউটারের ভেতরে কী থাকে
প্রসেসর (CPU)
প্রতিটি প্যাকেট পড়া, ঠিকানা মেলানো আর পথ ঠিক করা — সবই এর কাজ। প্রসেসর দুর্বল হলে বেশি ডিভাইস যুক্ত হওয়ামাত্র রাউটার হাঁপিয়ে ওঠে।
মেমোরি (RAM ও ROM)
RAM-এ থাকে চলমান কাজের হিসাব — কে কোন ঠিকানায় যুক্ত, কোন সংযোগ খোলা। ROM-এ থাকে চালু হওয়ার মূল নির্দেশনা।
ফার্মওয়্যার
রাউটারের নিজস্ব সফটওয়্যার। অ্যাডমিন প্যানেল, Wi-Fi সেটিংস, ফায়ারওয়াল — সবই এর অংশ। আপডেট রাখলে নিরাপত্তা আর স্থিতিশীলতা দুটোই ভালো থাকে।
নেটওয়ার্কের ভাষায় রাউটার কাজ করে OSI মডেলের Network Layer-এ, অর্থাৎ তৃতীয় স্তরে। এই স্তরটিই IP ঠিকানা নিয়ে কাজ করে — সে কারণেই রাউটার এক নেটওয়ার্ক থেকে আরেক নেটওয়ার্কে ডেটা পাঠাতে পারে, যেটা সুইচ বা হাব পারে না।
সিঙ্গেল ব্যান্ড আর ডুয়াল ব্যান্ড
দুই ধরনের রাউটার
- সিঙ্গেল ব্যান্ড
- শুধু ২.৪ GHz — দূরে পৌঁছায় ভালো, কিন্তু গতি কম আর ভিড় বেশি
- ডুয়াল ব্যান্ড
- ২.৪ GHz + ৫ GHz — কাছের ডিভাইস দ্রুত ব্যান্ডে, দূরেরগুলো বড় ব্যান্ডে
- ২.৪ GHz-এর বাস্তব গতি
- সাধারণত ৯০ Mbps-এর আশেপাশে
- ৫ GHz-এর বাস্তব গতি
- AC1200 শ্রেণিতে ৪০০–৪৫০ Mbps পর্যন্ত
- দেয়াল ভেদ করা
- ২.৪ GHz ভালো, ৫ GHz দুর্বল
- আজকের বাজারে
- নতুন কিনলে ডুয়াল ব্যান্ডই ধরে নেওয়া হয়
ইন্টারনেট ধীর লাগলে রাউটারের দিকটা যেভাবে দেখবেন
লাইন ঠিক আছে অথচ ধীর লাগছে — এমন হলে দোষটা প্রায়ই ঘরের ভেতরের অংশে, বাইরের লাইনে নয়। রাউটার একসাথে কত প্যাকেট সামলাতে পারে, তার একটা সীমা আছে; সেই সীমা ছুঁয়ে ফেললে গতি পড়তে শুরু করে।
নিচের তিনটি পরীক্ষা করলে বোঝা যায় সমস্যাটা রাউটারে, ডিভাইসে, নাকি লাইনে।
তিনটি পরীক্ষা
-
১
কেবল আর Wi-Fi আলাদা করে মাপুন
প্রথমে LAN কেবল দিয়ে সরাসরি যুক্ত হয়ে ip6.bd-তে টেস্ট চালান, তারপর একই টেস্ট Wi-Fi-তে। কেবলে গতি ঠিক অথচ Wi-Fi-তে অর্ধেক — তার মানে সমস্যাটা রাউটারের বেতার অংশে।
ip6.bd -
২
কোন ব্যান্ডে যুক্ত আছেন দেখুন
ফোনের Wi-Fi তালিকায় দেখুন ২.৪ GHz না ৫ GHz-এ যুক্ত আছেন। Wi-Fi অ্যানালাইজার জাতীয় অ্যাপ দিয়ে আশপাশে কোন চ্যানেলে ভিড় কম, সেটিও দেখে নেওয়া যায় — রাউটারের সেটিংসে ওই চ্যানেলটি বেছে দিলে অবস্থার উন্নতি হয়।
-
৩
পিং দেখে স্থিতিশীলতা যাচাই করুন
কমান্ড প্রম্পটে
ping google.com -n 20চালান। গড় পিং কম অথচ সর্বোচ্চ পিং অনেক বেশি হলে বুঝবেন সংযোগ অস্থির — গতির সংখ্যা ঠিক থাকলেও ব্যবহারে ঝাঁকুনি লাগবে।ping google.com -n 20
সাধারণ কিছু প্রশ্ন
রাউটার আর মডেমের পার্থক্য কী?
মডেম বা ONU বাইরের লাইনকে ইথারনেটে রূপান্তর করে। রাউটার সেই সংযোগ নিয়ে Wi-Fi ছড়ায় আর ডিভাইসগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেয়। আজকাল অনেক ডিভাইসে দুটো কাজ একসাথে থাকে, কিন্তু কাজ দুটো আলাদা।
রাউটার ছাড়া শুধু ONU দিয়ে চলে না?
একটিমাত্র ডিভাইস কেবল দিয়ে যুক্ত করলে চলে। কিন্তু Wi-Fi লাগলে বা একাধিক ডিভাইস চালাতে হলে রাউটার দরকার — যদি না ONU-তেই রাউটারের কাজটি বিল্ট-ইন থাকে।
রাউটার সব সময় চালু রাখা কি ঠিক?
হ্যাঁ, রাউটার টানা চলার জন্যই তৈরি। তবে খোলা ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখুন। মাসে একবার রিস্টার্ট দিলে মেমোরি পরিষ্কার হয়ে আচরণ স্থিতিশীল থাকে।
দামি রাউটার নিলে কি ইন্টারনেটের গতি বাড়বে?
প্যাকেজের গতির বেশি কিছুতেই পাওয়া যাবে না। তবে রাউটারই যদি বাধা হয়ে থাকে — পুরোনো, সিঙ্গেল ব্যান্ড বা ১০/১০০ পোর্টের — তাহলে ভালো রাউটারে গিয়ে প্যাকেজের পুরো গতিটা পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে Mbps আর MBps লেখাটিও কাজে লাগতে পারে।
কতদিন পর রাউটার বদলানো দরকার?
নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই। কিন্তু প্যাকেজের গতি রাউটারের সীমা ছাড়িয়ে গেলে, ফার্মওয়্যার আপডেট আসা বন্ধ হয়ে গেলে, বা ঘন ঘন সংযোগ কাটতে শুরু করলে বদলানোর কথা ভাবা যায়।
একসাথে অনেক ডিভাইস যুক্ত হলেই ধীর হয়ে যায়
রাউটারের প্রসেসর ও মেমোরির সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে। কিছু ডিভাইস ৫ GHz ব্যান্ডে সরিয়ে দিন, ব্যাকগ্রাউন্ডের বড় ডাউনলোড বন্ধ রাখুন। বারবার হলে বেশি ক্ষমতার রাউটার বিবেচনা করার সময় হয়েছে।
রাউটার থেকে দূরে গেলেই সংযোগ দুর্বল
৫ GHz ব্যান্ড দেয়াল ভেদ করতে পারে কম। দূরের ঘরের ডিভাইসগুলো ২.৪ GHz-এ রাখুন। রাউটারটি ঘরের মাঝামাঝি, খোলা জায়গায় আর মেঝে থেকে কিছুটা উঁচুতে বসালে কভারেজ ভালো হয়।
প্যাকেজ ১০০ Mbps, অথচ কিছুতেই পার হয় না
রাউটার বা ONU-র পোর্ট ১০/১০০ কি না দেখুন — এমন পোর্টের সর্বোচ্চ সীমা ৯৪ Mbps-এর কাছাকাছি। এর বেশি গতির প্যাকেজে গিগাবিট পোর্ট লাগবেই।
মাঝে মাঝে নিজে থেকেই সংযোগ কেটে যায়
ফার্মওয়্যার আপডেট আছে কি না দেখুন, আর রাউটারটি গরম হয়ে যাচ্ছে কি না হাত দিয়ে বুঝে নিন। বদ্ধ জায়গায় বা টিভির পেছনে রাখলে অনেক রাউটার গরম হয়ে অস্থির আচরণ করে।
সবই ঠিক, তবু গতি প্যাকেজের ধারেকাছে নেই
টেস্টের স্ক্রিনশট, কোন ডিভাইসে ও কীভাবে যুক্ত ছিলেন (কেবল না Wi-Fi, কোন ব্যান্ড) — এই তথ্যগুলো নিয়ে আপনার ইন্টারনেট সরবরাহকারীর সাপোর্ট টিমে যোগাযোগ করুন।